মূল বিষয়বস্তুতে যান

CooLWJ-এ খুঁজুন

选择搜索范围,输入关键词后按回车。

ভাষা

翩若惊鸿,婉若游龙,荣曜秋菊,华茂春松。—চমকে উড়ে ওঠা রাজহাঁসের মতো হালকা, সাঁতরানো ড্রাগনের মতো নমনীয়, শরতের চন্দ্রমল্লিকার মতো দীপ্ত, বসন্তের পাইনের মতো সুশোভন।

লুও দেবীর ফু

তিন রাজ্যের যুগ・ছাও ঝি

黄初三年,余朝京师,还济洛川。古人有言,斯水之神,名曰宓妃。感宋玉对楚王神女之事,遂作斯赋,其词曰: অর্থ:হুয়াংছু যুগের তৃতীয় বছরে আমি রাজদর্শনের জন্য রাজধানীতে যাই, ফেরার পথে লুও নদী পার হই। প্রাচীনেরা বলেছেন, এই নদীর দেবীর নাম মি ফেই। ছু রাজার কাছে সুং ইউয়ের বলা দেবীর কাহিনিতে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ফু রচনা করি, তার বয়ান এমন:

余从京域,言归东藩,背伊阙,越轘辕,经通谷,陵景山。日既西倾,车殆马烦。尔乃税驾乎蘅皋,秣驷乎芝田,容与乎阳林,流眄乎洛川。于是精移神骇,忽焉思散。俯则未察,仰以殊观。睹一丽人,于岩之畔。乃援御者而告之曰:“尔有觌于彼者乎?彼何人斯,若此之艳也!”御者对曰:“臣闻河洛之神,名曰宓妃。然则君王所见,无乃是乎?其状若何,臣愿闻之。” অর্থ:আমি রাজধানী থেকে পূর্বের সামন্তভূমিতে ফিরছিলাম, ইছুয়ে পেছনে ফেলে, হুয়ানইউয়ান পার হয়ে, থুংগু দিয়ে জিংশানে উঠলাম। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, রথ ও ঘোড়া ক্লান্ত। সুগন্ধি ঘাসে ভরা নদীতীরে রথ থামালাম, ঝি ঘাসের জমিতে চার ঘোড়াকে খাওয়ালাম, ইয়াংলিনে ধীরে ঘুরলাম, লুও নদীর দিকে তাকালাম। তখন চেতনা টলে গেল, মন চমকে উঠল, হঠাৎ চিন্তা ছড়িয়ে পড়ল। মাথা নিচু করে কিছুই দেখিনি, মাথা তুলে অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। পাহাড়ের পাথরের পাশে এক সুন্দরী দাঁড়িয়ে। সারথির হাত ধরে বললাম:“ওখানকার মানুষটিকে দেখেছ? কে তিনি, এমন অপরূপ রূপ তাঁর!”সারথি উত্তর দিল:“শুনেছি হে ও লুও নদীর দেবীর নাম মি ফেই। তবে মহারাজ যাঁকে দেখেছেন, তিনি কি সেই দেবী? তাঁর অবয়ব কেমন, তা শুনতে চাই।”

余告之曰:其形也,翩若惊鸿,婉若游龙,荣曜秋菊,华茂春松。髣髴兮若轻云之蔽月,飘飖兮若流风之回雪。远而望之,皎若太阳升朝霞。迫而察之,灼若芙蕖出渌波。秾纤得衷,修短合度。肩若削成,腰如约素。延颈秀项,皓质呈露,芳泽无加,铅华弗御。云髻峨峨,修眉联娟,丹唇外朗,皓齿内鲜。明眸善睐,靥辅承权,瓌姿艳逸,仪静体闲。柔情绰态,媚于语言。奇服旷世,骨像应图。披罗衣之璀粲兮,珥瑶碧之华琚。戴金翠之首饰,缀明珠以耀躯。践远游之文履,曳雾绡之轻裾。微幽兰之芳蔼兮,步踟蹰于山隅。于是忽焉纵体,以遨以嬉。左倚采旄,右荫桂旗。攘皓腕于神浒兮,采湍濑之玄芝。 অর্থ:আমি তাকে বললাম:তাঁর অবয়ব চমকে উড়ে ওঠা রাজহাঁসের মতো হালকা, সাঁতরানো ড্রাগনের মতো নমনীয়, শরতের চন্দ্রমল্লিকার মতো উজ্জ্বল, বসন্তের পাইনগাছের মতো সুশ্রী ও সমৃদ্ধ। কখনো মনে হয় পাতলা মেঘে ঢাকা চাঁদ, কখনো ঘূর্ণি বাতাসে ঘোরা তুষার। দূর থেকে দেখলে ভোরের রঙিন মেঘে উদিত সূর্যের মতো শুভ্র দীপ্তি; কাছে থেকে দেখলে স্বচ্ছ ঢেউ ফুঁড়ে ওঠা পদ্মের মতো উজ্জ্বল। দেহের ভরাট ও সরু গড়ন সুষম, উচ্চতা যথাযথ। কাঁধ যেন কেটে গড়া, কোমর বাঁধা সাদা রেশমের মতো সরু। দীর্ঘ সুন্দর গলায় শুভ্র ত্বক উন্মুক্ত, সুগন্ধি প্রলেপ বা প্রসাধনী কিছুই লাগানো নেই। মেঘের মতো উঁচু খোঁপা, দীর্ঘ সরু বাঁকানো ভ্রু, বাইরে উজ্জ্বল লাল ঠোঁট, ভেতরে ঝকঝকে সাদা দাঁত। উজ্জ্বল চোখের চাহনি মনোহর, গালের হাড়ের নিচে টোল, অপরূপ সুশ্রী দেহভঙ্গি, শান্ত মার্জিত আচরণ। কোমল অনুভব, মনোহর ভঙ্গি, কথাবার্তায় মাধুর্য। তাঁর অসাধারণ পোশাক জগতে অতুলনীয়, দেহের গড়ন যেন ছবির আদর্শ রূপ। উজ্জ্বল রেশমি বস্ত্র গায়ে, কানে মনোরম জেডের অলংকার। মাথায় সোনা ও মাছরাঙার পালকে সাজানো গয়না, দেহে উজ্জ্বল মুক্তার ঝলক। পায়ে নকশা করা ইউয়ানইউ জুতো, কুয়াশার মতো পাতলা রেশমের আঁচল মাটি ছুঁয়ে চলে। মৃদু অর্কিডের সুবাস ছড়িয়ে পাহাড়ের ধারে ধীর পায়ে ঘোরেন। হঠাৎ হালকা হয়ে স্বচ্ছন্দে ঘুরতে ও খেলতে লাগলেন। বাঁয়ে রঙিন পালকের ধ্বজা, ডানে দারুচিনিগাছের ডালের পতাকার ছায়া। ঐশী নদীতীরে শুভ্র কবজি মেলে প্রবল স্রোতের ধারে কালো ঝি ঘাস তুললেন।

余情悦其淑美兮,心振荡而不怡。无良媒以接欢兮,托微波而通辞。愿诚素之先达兮,解玉佩以要之。嗟佳人之信修,羌习礼而明诗。抗琼珶以和予兮,指潜渊而为期。执眷眷之款实兮,惧斯灵之我欺。感交甫之弃言兮,怅犹豫而狐疑。收和颜而静志兮,申礼防以自持。 অর্থ:তাঁর কোমল সৌন্দর্যে আমার মন মুগ্ধ, হৃদয় আলোড়িত ও অশান্ত। মিলনের জন্য উপযুক্ত দূত নেই, তাই মৃদু ঢেউয়ের হাতে কথা সঁপে দিই। চাই আমার নির্মল আন্তরিকতা আগে পৌঁছোক, জেডের অলংকার খুলে তাঁকে আমন্ত্রণ জানাই। আহা, সুন্দরী সত্যিই অপরূপ, আচার জানেন, কবিতাও বোঝেন। তিনি সুন্দর জেড তুলে আমার কথায় সাড়া দেন, গভীর জল দেখিয়ে মিলনের প্রতিশ্রুতি দেন। গভীর অনুরাগের আন্তরিকতা ধরে রেখেও ভয় হয়, এই দেবী আমাকে ছলনা করবেন। জিয়াওফুর প্রতি প্রতিশ্রুতি ভাঙার কথা মনে পড়ে বিষাদ, দ্বিধা ও সংশয় জাগে। মুখের হাসি গুটিয়ে মন শান্ত করি, আচারনীতির সংযমে নিজেকে ধরে রাখি।

于是洛灵感焉,徙倚彷徨。神光离合,乍阴乍阳。竦轻躯以鹤立,若将飞而未翔。践椒涂之郁烈,步蘅薄而流芳。超长吟以永慕兮,声哀厉而弥长。尔乃众灵杂遝,命俦啸侣。或戏清流,或翔神渚。或采明珠,或拾翠羽。从南湘之二妃,携汉滨之游女。叹匏瓜之无匹兮,咏牵牛之独处。扬轻袿之猗靡兮,翳修袖以延伫。体迅飞凫,飘忽若神。凌波微步,罗袜生尘。动无常则,若危若安。进止难期,若往若还。转眄流精,光润玉颜。含辞未吐,气若幽兰。华容婀娜,令我忘餐。 অর্থ:লুও নদীর দেবী এতে আবেগে বিহ্বল হয়ে ইতস্তত ঘুরতে লাগলেন। তাঁর ঐশী আভা কখনো মিলিয়ে যায়, কখনো মিলে ওঠে, কখনো অন্ধকার, কখনো আলো। সারসের মতো হালকা দেহ উঁচু করে দাঁড়ালেন, যেন উড়বেন, অথচ উড়ছেন না। গোলমরিচের তীব্র সুবাসমাখা পথে পা রাখলেন, সুগন্ধি ঘাসের ঝোপ পেরিয়ে সুবাস ছড়ালেন। গভীর আকুলতায় দীর্ঘ সুর তুললেন, সেই করুণ তীক্ষ্ণ ধ্বনি আরও দীর্ঘ হলো। তখন দেবতারা দলে দলে এসে সঙ্গীদের ডাকলেন। কেউ স্বচ্ছ স্রোতে খেলে, কেউ দেবচরে ওড়ে। কেউ উজ্জ্বল মুক্তা কুড়োয়, কেউ মাছরাঙার পালক তোলে। দক্ষিণ শিয়াংয়ের দুই দেবী তাঁর সঙ্গে, হান নদীর দেবকন্যার হাত তিনি ধরে আছেন। সঙ্গীহীন পাওগুয়া তারার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, নিঃসঙ্গ ছিয়াননিউ তারার জন্য গান করেন। বাতাসে দুলতে থাকা হালকা পোশাক উড়িয়ে, দীর্ঘ হাতায় আলো আড়াল করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর দেহ উড়ন্ত বুনোহাঁসের মতো ক্ষিপ্র, দেবতার মতো অনির্দিষ্ট গতিতে ভাসে। ঢেউয়ের ওপর হালকা পায়ে হাঁটেন, রেশমি মোজা থেকে ধুলোর মতো জলকণা ওঠে। তাঁর চলাফেরার বাঁধা নিয়ম নেই, কখনো বিপন্ন, কখনো নিশ্চিন্ত মনে হয়। এগোনো-থামা বোঝা যায় না, যেন যাচ্ছেন, আবার যেন ফিরছেন। দৃষ্টি ফেরাতেই জ্যোতি খেলে যায়, জেডসম মুখে স্নিগ্ধ দীপ্তি। কথা ঠোঁটে এলেও উচ্চারিত হয় না, নিঃশ্বাস অর্কিডের মতো সুবাসিত। তাঁর অপরূপ নমনীয় সৌন্দর্যে আমি আহার ভুলে যাই।

于是屏翳收风,川后静波。冯夷鸣鼓,女娲清歌。腾文鱼以警乘,鸣玉鸾以偕逝。六龙俨其齐首,载云车之容裔。鲸鲵踊而夹毂,水禽翔而为卫。于是越北沚,过南冈,纡素领,回清阳,动朱唇以徐言,陈交接之大纲。恨人神之道殊兮,怨盛年之莫当。抗罗袂以掩涕兮,泪流襟之浪浪。悼良会之永绝兮,哀一逝而异乡。无微情以效爱兮,献江南之明珰。虽潜处于太阴,长寄心于君王。忽不悟其所舍,怅神宵而蔽光。 অর্থ:তখন পিংই বাতাস থামালেন, ছুয়ানহৌ ঢেউ শান্ত করলেন। ফেংই ঢাক বাজালেন, নুওয়া নির্মল সুরে গান করলেন। নকশাদার মাছ লাফিয়ে রথ পাহারা দিল, জেডের ঘণ্টা বাজিয়ে সকলে একসঙ্গে চলে গেল। ছয় ড্রাগন মাথা সমান রেখে গম্ভীরভাবে এগোল, মেঘরথকে ধীরে বহন করল। দুই পাশে তিমিরা লাফাল, জলপাখিরা উড়ে পাহারা দিল। উত্তর চর পেরিয়ে, দক্ষিণ পাহাড় অতিক্রম করে তিনি শুভ্র গলা ঘোরালেন, উজ্জ্বল চোখমুখ ফেরালেন, লাল ঠোঁট নেড়ে ধীরে কথা বললেন, সম্পর্কের মূল কথা জানালেন। মানুষ ও দেবতার পথ আলাদা বলে তাঁর আক্ষেপ, যৌবনেও মিলন সম্ভব নয় বলে বেদনা। রেশমি হাতা তুলে চোখের জল আড়াল করলেন, অবিরল অশ্রুতে বুকের কাপড় ভিজল। সুন্দর মিলন চিরতরে শেষ হওয়ায় শোক, একবার চলে গেলে দুজন ভিন্ন দেশে থাকবেন বলে দুঃখ। সূক্ষ্ম সোহাগে প্রেম জানাতে না-পেরে নদীর দক্ষিণের উজ্জ্বল মুক্তার দুল উপহার দিলেন। গভীর অন্ধকার জলপুরীতে থাকলেও চিরকাল মহারাজের কাছে তাঁর হৃদয় রইবে। হঠাৎ বোঝা গেল না তিনি কোথায় গেলেন; দেবতারা অদৃশ্য হয়ে দীপ্তি ঢেকে যাওয়ায় আমি বিষণ্ন হলাম।

于是背下陵高,足往神留。遗情想像,顾望怀愁。冀灵体之复形,御轻舟而上溯。浮长川而忘返,思绵绵而增慕。夜耿耿而不寐,沾繁霜而至曙。命仆夫而就驾,吾将归乎东路。揽騑辔以抗策,怅盘桓而不能去。 অর্থ:তারপর নিচু স্থান ছেড়ে উঁচুতে উঠলাম, পা চলল, মন রয়ে গেল। অবশিষ্ট অনুরাগে তাঁর রূপ কল্পনা করলাম, ফিরে তাকিয়ে বিষাদে ভরলাম। দেবী আবার দেখা দেবেন এই আশায় হালকা নৌকায় উজানে চললাম। দীর্ঘ নদীতে ভেসে ফেরার কথা ভুললাম, অবিরাম চিন্তায় আকুলতা বাড়ল। সারারাত অশান্তিতে ঘুম হলো না, ভোর পর্যন্ত ঘন তুষারে ভিজলাম। ভৃত্যকে রথ প্রস্তুত করতে বললাম, পূর্বমুখী ফেরার পথ ধরব। লাগাম ধরে চাবুক তুলেও বিষণ্ন আকুলতায় ঘুরতে থাকলাম, চলে যেতে পারলাম না।

কাব্যের অনুভব বয়ে চলুক

কবিতার আবহের অ্যানিমেশন

অ্যানিমেশনের বিষয়বস্তু মূল চীনা সংস্করণে রাখা হয়েছে।

অ্যানিমেশন প্রস্তুত।

AI দিয়ে আঁকা ছবি

অনুবাদ

হুয়াংছু যুগের তৃতীয় বছরে আমি রাজদর্শনের জন্য রাজধানীতে গিয়েছিলাম, ফেরার পথে লুও নদী পার হলাম। প্রাচীনেরা বলেছেন, এই নদীর দেবীর নাম মি ফেই। ছু রাজার কাছে সুং ইউয়ের বলা দেবীর কাহিনিতে অনুপ্রাণিত হয়ে তাই এই ফু রচনা করলাম। ফু-টির বয়ান এমন:

আমি রাজধানী লুওইয়াং থেকে রওনা হয়ে পূর্বে আমার সামন্তভূমি জুয়ানচেংয়ে ফিরছিলাম। ইছুয়ে পেছনে ফেলে, হুয়ানইউয়ান পার হয়ে, থুংগু দিয়ে জিংশানে উঠলাম। তখন সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, রথ আর ঘোড়া ক্লান্ত। তাই দুহেং ঘাসে ভরা তীরে রথ থামালাম, ঝি ঘাস জন্মানো জমিতে ঘোড়াদের খাওয়ালাম। নিজে ইয়াংলিনে পায়চারি করতে করতে লুও নদীর বিস্তৃত জলরাশির দিকে তাকালাম। অজান্তেই মন ঘোরে আচ্ছন্ন হলো, চিন্তা ছড়িয়ে পড়ল। মাথা নিচু করে কিছুই দেখিনি, কিন্তু মাথা তুলতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল—পাহাড়ের পাথরের পাশে দাঁড়িয়ে এক অতুল সুন্দরী। পাশে থাকা সারথির হাত ধরে বলে উঠলাম:「ওখানকার মানুষটিকে দেখেছ? কে তিনি, এমন অপরূপ রূপ তাঁর!」সারথি উত্তর দিল:「শুনেছি হে ও লুও নদীর দেবীর নাম মি ফেই। তবে মহারাজ যাঁকে দেখেছেন, তিনি কি সেই দেবী? তাঁর রূপ কেমন, তা শুনতে চাই।」

আমি তাকে বললাম:তাঁর অবয়ব চমকে উড়ে ওঠা বুনোরাজহাঁসের মতো হালকা, সাঁতরানো ড্রাগনের মতো নমনীয়। মুখের দীপ্তি শরতের রোদে চন্দ্রমল্লিকার মতো, দেহের সুষমা বসন্তবাতাসে সবুজ পাইনগাছের মতো। পাতলা মেঘে ঢাকা চাঁদের মতো তিনি কখনো দেখা দেন, কখনো আড়াল হন; ঘূর্ণিবাতাসে পাক খাওয়া তুষারের মতো ভাসেন। দূর থেকে দেখলে ভোরের রঙিন মেঘে উদিত সূর্যের মতো উজ্জ্বল ও নির্মল; কাছে থেকে দেখলে স্বচ্ছ ঢেউয়ের মধ্যে সদ্য ফোটা পদ্মের মতো সজীব সুন্দর। তাঁর দেহগড়ন সুষম, উচ্চতা যথাযথ, কাঁধ সরু যেন কেটে গড়া, কোমর সরু যেন বেঁধে রাখা; সুন্দর গলায় শুভ্র ত্বক উন্মুক্ত। তেলও মাখেননি, মুখে গুঁড়ো প্রসাধনও দেননি; মেঘের মতো উঁচু খোঁপা, লম্বা সরু বাঁকানো ভ্রু, সজীব লাল ঠোঁট, শুভ্র দাঁত, চাহনিতে পারদর্শী এক জোড়া উজ্জ্বল চোখ, আর দুই গালের হাড়ের নিচে মিষ্টি টোল। তাঁর ভঙ্গি মার্জিত ও মনোহর, আচরণ নম্র ও শান্ত, ভাব কোমল ও স্নিগ্ধ, কথা যথাযথ ও প্রীতিকর। লুও দেবীর পোশাকের অপূর্ব শোভা পৃথিবীতে অতুলনীয়, দেহের গড়ন ছবিতে আঁকা রূপের মতো। তাঁর গায়ে উজ্জ্বল রেশমি পোশাক, সঙ্গে সুন্দর জেডের গয়না। মাথায় সোনা-রুপো ও মাছরাঙার পালকে সাজানো অলংকার, সারা দেহে ঝলমলে মুক্তা। পায়ে নকশা করা ইউয়ানইউ জুতো, কুয়াশার মতো পাতলা পোশাকের নিচের অংশ টেনে চলেন; মৃদু অর্কিডের সুবাস ছড়িয়ে পাহাড়ের ধারে ঘোরেন। হঠাৎ হালকা পায়ে এগিয়ে চলতে ও খেলতে লাগলেন; বাঁয়ে রঙিন পালকের ধ্বজা, ডানে দারুচিনিগাছের ডালের পতাকার ছায়া। নদীতীরে শুভ্র হাত বাড়িয়ে স্রোতের ধারের কালো ঝি ঘাস তুললেন।

তাঁর কোমল সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আমার হৃদয় অজান্তেই আলোড়িত ও অশান্ত হলো। উপযুক্ত দূত নেই বলে ছোট ছোট ঢেউয়ের সাহায্যেই কথা পৌঁছে দিতে হলো। চাইছিলাম আমার আন্তরিক মনের কথা অন্যদের আগে পৌঁছোক, তাই জেডের অলংকার খুলে তাঁকে আমন্ত্রণ জানালাম। আহা, সুন্দরী সত্যিই অপরূপ, আচারনীতি বোঝেন, কথাতেও নিপুণ। তিনি সুন্দর জেড তুলে আমার কথার সাড়া দিলেন, গভীর স্রোত দেখিয়ে মিলনের প্রত্যাশা জানালেন। গভীর অনুরাগের আন্তরিকতা মনে রেখেও ভয় হচ্ছিল, দেবী আমাকে ছলনা করবেন না তো। ঝেং জিয়াওফুর সঙ্গে দেবীর প্রতিশ্রুতি ভাঙার ঘটনা মনে পড়ে অজান্তেই বিষণ্ন, দ্বিধাগ্রস্ত ও সন্দিহান হলাম; তাই মুখের হাসি গুটিয়ে মন শান্ত করলাম, আচারনীতি দিয়ে নিজেকে সংযত রাখলাম।

তখন লুও দেবী গভীরভাবে আপ্লুত হয়ে ধীর পায়ে ইতস্তত ঘুরতে লাগলেন; ঐশী আভা কখনো বিচ্ছিন্ন, কখনো মিলিত, কখনো উজ্জ্বল, কখনো ম্লান। সারসের মতো হালকা দেহ উঁচু করলেন, যেন উড়বেন অথচ এখনও ওড়েননি; আবার গোলমরিচের তীব্র সুবাসে ভরা পথে পা রেখে দুহেং ঘাসের ঝোপ পেরিয়ে সুবাস ছড়ালেন। হঠাৎ বিষণ্ন দীর্ঘ সুরে গভীর আকুলতা জানালেন, কণ্ঠ করুণ ও দীর্ঘ। তখন দেবতারা দলে দলে এসে সঙ্গীদের ডাকলেন; কেউ স্বচ্ছ স্রোতে খেলে, কেউ অলৌকিক চরে ওড়ে, কেউ উজ্জ্বল মুক্তা সংগ্রহ করে, কেউ ঝুঁকে মাছরাঙার পালক তোলে। লুও দেবীর পাশে দক্ষিণ শিয়াংয়ের দুই দেবী এহুয়াং ও ন্যুইইং, তিনি হান নদীর দেবীর হাত ধরে আছেন; সঙ্গীহীন হুগুয়া তারার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন, নিঃসঙ্গ ছিয়াননিউ তারার জন্য করুণ গান গাইছেন। কখনো বাতাসে দুলতে থাকা ঊর্ধ্ববাস তুলে, লম্বা হাতা দিয়ে আলো আড়াল করে দূরে তাকিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন; কখনো আবার উড়ন্ত বুনোহাঁসের মতো হালকা ও ক্ষিপ্র শরীরে অনির্দিষ্ট গতিতে ভাসেন। জলের ঢেউয়ের ওপর হাঁটেন, রেশমি মোজায় ছিটকে ওঠা জলকণা ধুলোর মতো। তাঁর চলা-থামার নিয়ম নেই, কখনো বিপন্ন, কখনো নিশ্চিন্ত মনে হয়; এগোনো-পেছোনো বোঝা যায় না, যেন যাচ্ছেন, আবার যেন ফিরছেন। দুই চোখের ঘোরায় দীপ্তি খেলে যায়, মুখে স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতা, কথা উচ্চারিত হওয়ার আগেই নিঃশ্বাসে অর্কিডের সুবাস। তাঁর নমনীয় মনোহর অবয়ব দেখে আমার খাওয়াদাওয়ার কথা মনেই থাকে না।

তখন বায়ুদেব পিংই সন্ধ্যার বাতাস থামালেন, জলদেব ছুয়ানহৌ ঢেউ শান্ত করলেন, ফেংই ঐশী ঢাক বাজালেন, নুওয়া নির্মল শীতল সুরে গান ধরলেন। লাফিয়ে ওঠা নকশাদার মাছ লুও দেবীর রথ পাহারা দিল, ঝনঝন করা জেডের ঘণ্টার সঙ্গে দেবতারা একসঙ্গে বিদায় নিলেন। ছয় ড্রাগন মাথা সমান রেখে মেঘরথকে ধীরে এগিয়ে নিল। দুই পাশে তিমিরা লাফাল, জলপাখিরা চারদিকে উড়ে পাহারা দিল। রথ উত্তরের বালুচর পেরিয়ে দক্ষিণের পাহাড় অতিক্রম করলে লুও দেবী শুভ্র গলা ঘুরিয়ে সুন্দর চোখমুখ ফেরালেন, লাল ঠোঁট একটু খুলে ধীরে সম্পর্কের মূল কথাগুলো জানালেন। শুধু এই আক্ষেপ, মানুষ ও দেবতা আলাদা, দুজনেই যৌবনে থাকলেও মনের ইচ্ছা পূরণ হবে না। বলতে বলতে রেশমি হাতা তুলে মুখ ঢেকে কাঁদলেন, অবিরল অশ্রুতে বুকের কাপড় ভিজল। আনন্দের মিলন এভাবেই চিরতরে শেষ হওয়ায় তিনি শোক করলেন; এই বিদায়ে দুজন দুই জায়গায় থাকবেন, সূক্ষ্ম সোহাগে ভালোবাসা জানানো হয়নি, তাই উজ্জ্বল মুক্তার দুলই চিরস্মৃতি হিসেবে দিতে পারেন। গভীর অন্ধকার জলপুরীতে থাকলেও তিনি সর্বদা মহারাজকে মনে রাখবেন। কথা শেষ করতেই লুও দেবী কোথায় গেলেন বোঝা গেল না; এক মুহূর্তে দেবতারা অদৃশ্য হয়ে দীপ্তি গুটিয়ে নেওয়ায় আমি গভীর বিষাদ অনুভব করলাম।

তারপর আমি নিচু জায়গা ছেড়ে উঁচুতে উঠলাম; পা এগোলেও মন আগের জায়গাতেই রইল। অনুরাগে জড়িয়ে বারবার মিলনের দৃশ্য আর লুও দেবীর রূপ কল্পনা করছিলাম; ফিরে তাকালে বিষাদ আরও ঘিরে ধরছিল। দেবী আবার দেখা দেবেন এই আশায় সব ভুলে হালকা নৌকায় উজানে চললাম। দীর্ঘ লুও নদী বেয়ে যেতে যেতে ফেরার কথা ভুলে গেলাম, অথচ আকুলতা অবিরাম বেড়েই চলল; সারারাত মন অশান্ত, ঘুম এলো না, ভোর পর্যন্ত শরীর ঘন তুষারে ভিজল। বাধ্য হয়ে ভৃত্যকে ঘোড়া ও রথ প্রস্তুত করতে বললাম, পূর্বদিকে ফেরার পথে রওনা হলাম; কিন্তু লাগাম হাতে নিয়ে চাবুক তুলতে গিয়েই আবার হারানোর বেদনায় থেমে গেলাম, মায়ায় ঘুরতে লাগলাম, যেতে পারলাম না।


টীকা

黄初三年:ওয়েই সম্রাট ওয়েন, ছাও পি-র হুয়াংছু রাজত্বকালের তৃতীয় বছর, অর্থাৎ খ্রিস্টাব্দ 222। রচনার শুরুতে নিজের বয়ানে লেখক সামন্তভূমিতে ফেরার পথে লুও নদী পার হওয়ার পটভূমি জানিয়েছেন।

东藩:পূর্বদিকে লেখকের সামন্তভূমি।伊阙、轘辕、通谷、景山:ইছুয়ে, হুয়ানইউয়ান, থুংগু ও জিংশান—লুওইয়াংয়ের আশপাশের গিরিপথ, উপত্যকা ইত্যাদির নাম, যা ফেরার পথের ধারাবিবরণ গড়েছে।

宓妃:মি ফেই, কিংবদন্তির লুও নদীর দেবী।宋玉神女之事:সুং ইউয়ের ফু-তে ছু রাজা ও দেবীর কাহিনি; এই সাহিত্যিক ঐতিহ্য থেকেই বর্তমান ফু-টির ভাবনা অনুপ্রেরণা পেয়েছে।

税驾:রথ থামিয়ে বিশ্রাম নেওয়া।蘅皋:সুগন্ধি ঘাস জন্মানো নদীতীরের উঁচু জমি।秣驷:রথের চারটি ঘোড়াকে খাওয়ানো।容与:ধীরে স্বচ্ছন্দে পায়চারি করার ভঙ্গি।流眄:দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখা।觌(dí):দেখা।

惊鸿、游龙:যথাক্রমে হালকা দেহভঙ্গি এবং নমনীয় অবয়বের উপমা।芙蕖:পদ্মফুল।渌:স্বচ্ছ।秾纤得衷:ভরাট ও সরু গড়নের যথাযথ সামঞ্জস্য।修短:উচ্চতা, লম্বা বা বেঁটে হওয়া।约素:বেঁধে রাখা সাদা রেশম, কোমরের বর্ণনায় ব্যবহৃত।

铅华:সাজসজ্জার জন্য ব্যবহৃত প্রসাধনী।修眉联娟:দীর্ঘ, সরু, বাঁকানো ভ্রু।靥辅:গালের টোল।权:গালের হাড়।瓌 একই অর্থে “瑰”, অর্থ সুন্দর।闲:মার্জিত ও শান্ত।

珥:কানের অলংকার পরা।瑶碧、华琚:সুন্দর জেড এবং জেডের গয়না।远游:এক ধরনের জুতোর নাম।雾绡:কুয়াশার মতো হালকা পাতলা রেশমি কাপড়।芳蔼:সুবাস।踟蹰:ধীর পায়ে পায়চারি করা।

采旄、桂旗:রঙিন পালক ও দারুচিনিগাছের ডাল দিয়ে সাজানো আনুষ্ঠানিক ধ্বজা।攘皓腕:শুভ্র কবজি তোলা বা বাড়িয়ে দেওয়া।浒:জলের ধার।湍濑:খরস্রোত।玄芝:পুরাণের লিংঝি নামের ঐশী ছত্রাক।

诚素:আন্তরিক ও নির্মল মনোভাব।要(yāo):আমন্ত্রণ জানানো, সাক্ষাতের কথা স্থির করা।信修:সত্যিই সুন্দর।琼珶:সুন্দর জেড।款实:আন্তরিক অনুভূতি।

交甫:ঝেং জিয়াওফু; কিংবদন্তি অনুসারে তিনি হান নদীর দেবীদের দেখা পেয়ে জেডের অলংকার উপহার পেয়েছিলেন, পরে দেবীরা ও সেই অলংকার দুটোই অদৃশ্য হয়ে যায়। লেখক এই ঘটনা দিয়ে মানুষ ও দেবীর মিলন স্থায়ী হবে কি না, সেই সংশয় ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।礼防:আচার ও নীতির সংযম।

洛灵:লুও নদীর দেবী।徙倚:ইতস্তত ঘোরা।椒涂、蘅薄:সুবাসিত পথ এবং সুগন্ধি ঘাসের ঝোপ।杂遝:দলে দলে জড়ো হওয়া।俦、侣:সঙ্গী।

南湘之二妃:কিংবদন্তির এহুয়াং ও ন্যুইইং।汉滨之游女:হান নদীর দেবী।匏瓜、牵牛:পাওগুয়া ও ছিয়াননিউ, দুটি তারার নাম; এখানে তারাদের নিঃসঙ্গতা দিয়ে বিচ্ছেদের অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে।

轻袿(guī):হালকা কোমল নারীদের পোশাক।翳:আড়াল করা।延伫:দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা।飞凫:উড়ন্ত বুনোহাঁস।凌波:ঢেউয়ের ওপর পা ফেলে চলা।尘:এখানে ধুলো দিয়ে অতি সূক্ষ্ম জলকণার উপমা দেওয়া হয়েছে, দেবীর পদচারণা বোঝাতে।

屏翳:পিংই, পুরাণের এক দেবতা, এখানে বায়ুর অধিপতি।川后:জলের দেবতা।冯夷:ফেংই, নদীর দেবতা।女娲:নুওয়া, পুরাণের দেবী।文鱼:গায়ে নকশা থাকা মাছ।玉鸾:রথে জেড দিয়ে সাজানো ঘণ্টা।

毂:চাকার কেন্দ্র, এখানে রথ বোঝায়।沚:জলের মাঝের ছোট চর।纡素领:শুভ্র গলা ঘোরানো।清阳:ভ্রু ও চোখের মধ্যেকার দীপ্তি।袂:পোশাকের হাতা।浪浪:অবিরত অশ্রু ঝরার অবস্থা।

明珰:উজ্জ্বল মুক্তার কানের গয়না।太阴:গভীর অন্ধকার জলপুরী।神宵:দেবতার দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাওয়া; এই পঙ্‌ক্তিতে দেবীর গন্তব্য অস্পষ্ট হওয়া ও দীপ্তি মিলিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

背下陵高:নিচু স্থান ছেড়ে উঁচুতে ওঠা।上溯:স্রোতের বিপরীতে উজানে যাওয়া।耿耿:মনের অশান্তিতে ঘুমোতে না-পারা।騑辔(fēi pèi):রথের ঘোড়ার লাগাম।抗策:ঘোড়ার চাবুক তোলা।盘桓:এগোতে না-পেরে ঘোরাঘুরি করা।

পাঠের নির্দেশনা:রচনায় মানুষ ও দেবীর প্রেম ফু-টির শৈল্পিক কল্পনার অংশ; লুও দেবীকে সরাসরি বাস্তবের কোনো নির্দিষ্ট নারী বলে শনাক্ত করা শুধু এই রচনার ভিত্তিতে প্রমাণ করা যায় না।

রচনার পরিচিতি

《洛神赋》 বা ‘লুও দেবীর ফু’ চীনের তিন রাজ্যের যুগে ছাও ওয়েই রাজ্যের সাহিত্যিক ছাও ঝি রচিত একটি বিখ্যাত ফু, অর্থাৎ কাব্যগদ্য রচনা। যুদ্ধরত রাজ্যসমূহের যুগে ছু রাজ্যের সুং ইউয়ের 《神女赋》 বা ‘দেবীর ফু’-তে উশানের দেবীর বর্ণনা অনুসরণ করে ছাও ঝি লুও নদীর তীরে নিজের সঙ্গে লুও দেবীর সাক্ষাতের কাহিনি বলেছেন; কাহিনির বিন্যাস ও চরিত্রচিত্রণে সুংয়ের ফু থেকে অনেক কিছু নিয়েছেন। এই ফু-তে লেখক নিজের সঙ্গে লুও দেবীর আকস্মিক সাক্ষাৎ ও পারস্পরিক আকুল প্রেম কল্পনা করেছেন। দেবীর রূপ অতুলনীয়, মানুষ ও দেবীর প্রেম আবছা ও রহস্যময়; কিন্তু তাঁদের পথ আলাদা হওয়ায় মিলন হয় না, শেষে অসীম দুঃখ ও বিষাদ প্রকাশ পায়। পুরো রচনাটি মোটামুটি ছয় ভাগে বিভক্ত:প্রথম ভাগে লেখক লুওইয়াং থেকে নিজের সামন্তভূমিতে ফেরার সময় পাহাড়ের খাড়াইয়ে দাঁড়ানো 「丽人」—সুন্দরী—মি ফেইকে দেখেন; দ্বিতীয় ভাগে মি ফেইয়ের রূপ, ভঙ্গি ও পোশাকের সৌন্দর্য; তৃতীয় ভাগে লেখকের গভীর অনুরাগ—দেবী আচার জানেন, কথাতেও দক্ষ, লেখক আন্তরিকতা জানিয়ে প্রেমচিহ্ন দিয়েছেন, সাক্ষাতের কথাও হয়েছে, তবু ছলনার ভয় আছে—এই অংশে প্রেমের গভীরতা তীব্রভাবে প্রকাশিত; চতুর্থ ভাগে 「君王」—মহারাজের—আন্তরিকতায় আপ্লুত হওয়ার পর লুও দেবীর অবস্থা; পঞ্চম ভাগে সমগ্র রচনার অন্তর্নিহিত অভিপ্রায়; ষষ্ঠ ভাগে বিচ্ছেদের পর লেখকের দেবীকে স্মরণ। পুরো ফু-র ভাষা সমৃদ্ধ সুন্দর, বর্ণনা সূক্ষ্ম, কল্পনা সমৃদ্ধ, অনুভব গভীর ও স্নেহময়, যেন এর ভেতরে অন্য কোনো অভিপ্রায়ও নিহিত।

রসাস্বাদন ও বিশ্লেষণ

কবিতা ও ফু রচনায় ছাও ঝির অসাধারণ কৃতিত্ব রয়েছে। তাঁর ফু পূর্ব ও পশ্চিম হান যুগ থেকে চলে আসা ছোট গীতিময় ফু-র ঐতিহ্য গ্রহণ করেছে, আবার ছু গীতিকাব্যের রোমান্টিক চেতনাও আত্মস্থ করেছে, ফলে ফু-র বিকাশে নতুন দিগন্ত খুলেছে। 《洛神赋》 বা ‘লুও দেবীর ফু’ তাঁর ফু রচনাগুলোর অন্যতম শ্রেষ্ঠ। রোমান্টিক শিল্পরীতিতে স্বপ্নময় জগতের মাধ্যমে লেখক মানুষ ও দেবীর আন্তরিক প্রেম এঁকেছেন, কিন্তু শেষে 「人神殊道」—মানুষ ও দেবতার পথ পৃথক—হওয়ায় মিলন অসম্ভব, বিষাদে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে।

রচনাটি রাজধানী ত্যাগ করে 「背伊阙,越轘辕,经通谷,陵景山」—ইছুয়ে পেছনে ফেলে, হুয়ানইউয়ান পার হয়ে, থুংগু দিয়ে জিংশানে ওঠার যাত্রাবিবরণ দিয়ে শুরু হয়েছে; লেখক ও তাঁর অনুচরদের লুও নদীর তীরে পৌঁছানোর দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে। তখন 「日既西倾,车殆马烦」—সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, রথ ও ঘোড়া ক্লান্ত; তাঁরা সুগন্ধি ঘাসে ভরা উঁচু নদীতীরে রথ থামালেন, ঝি ঘাসের জমিতে চার ঘোড়াকে খাওয়ালেন, ইয়াংলিনে ধীর পায়ে ঘুরলেন, লুও নদীর দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। শান্ত পরিবেশে লেখক ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ঝলমলে লুও নদীর দিকে দূরদৃষ্টি মেললেন। ঘটনাচক্রে মাথা তোলার মুহূর্তেই অলৌকিক দৃশ্য দেখা দিল:বিপরীত পাহাড়ের খাড়াইয়ে দাঁড়িয়ে এক অতুল রূপসী দেবী। লেখক ভীষণ বিস্মিত হয়ে অজান্তেই পাশের সারথিকে ধরে ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞেস করলেন:「尔有觌于彼者乎?彼何人斯,若此之艳也!」—ওখানে কাউকে দেখেছ? কে তিনি, এমন অপরূপ সুন্দর! এখানে নদীতীরের পাহাড়ের পাশে সূর্যাস্তের আগের সুন্দর দৃশ্য চরিত্রের আকস্মিক আবিষ্কারের বিস্ময় ও আনন্দকে ফুটিয়ে তুলে এক আকর্ষক কাব্যলোক সৃষ্টি করেছে। এরপর সারথির উত্তরও অত্যন্ত কুশলী; লেখকের প্রথম প্রশ্ন—「尔有觌于彼者乎」, অর্থাৎ ওখানে কাউকে দেখেছ কি না—এড়িয়ে গিয়ে, 「臣闻」「无乃」—‘আমি শুনেছি’, ‘তবে কি’—এমন অনুমানসূচক ভঙ্গিতে গম্ভীরভাবে লুও দেবী মি ফেইয়ের কথা বলে। এতে পরের দেবীবর্ণনার পূর্বসূত্র তৈরি হওয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই অদ্ভুত এই সাক্ষাৎ আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। কিংবদন্তি অনুসারে লুও দেবী মি ফেই সুদূর প্রাচীনকালের মি শি-র কন্যা; লুও নদীতে ডুবে মারা গিয়ে তিনি জলদেবী হন। এই প্রাচীন কিংবদন্তির দেবীর উল্লেখ ছু ইউয়ান 《天问》 বা ‘স্বর্গের কাছে প্রশ্ন’ এবং 《离骚》 বা ‘লিসাও’—দুই রচনাতেই করেছেন। পরে সিমা শিয়াংরু ও ঝাং হেং তাঁদের ফু-তে তাঁকে এভাবে বর্ণনা করেছেন:「若夫青琴宓妃之徒,绝殊离俗,妖冶娴都,靓妆刻饰,便环绰约。……芬芳沤郁,酷烈淑郁;皓齿灿烂,宜笑的皪;长眉连娟,微睇绵藐」(《上林赋》)—ছিংছিন, মি ফেই প্রমুখ লোকসাধারণের থেকে অসাধারণভাবে পৃথক, মোহনীয় ও মার্জিত, যত্নে সজ্জিত, নমনীয় ও লাবণ্যময়।……তাঁদের সুবাস ঘন ও তীব্র; শুভ্র দাঁত দীপ্তিমান, হাসি উজ্জ্বল; দীর্ঘ ভ্রু সরু বাঁকানো, আড়চোখের দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী (‘শাংলিন ফু’); 「载太华之玉女兮,召洛浦之宓妃。咸姣丽以蛊媚兮,增嫮眼而蛾眉。舒妙婧之纤腰兮,扬杂错之袿徽。离朱唇而微笑兮,颜的砾以遗光……」(《思玄赋》)—থাইহুয়া পর্বতের জেডকন্যাকে বহন করি, লুওতীরের মি ফেইকে ডাকি। সকলেই সুন্দর ও মায়াময়, মনোহর চোখ আর পতঙ্গশুঁড়ের মতো বাঁকানো ভ্রুতে আরও শোভা। সুশ্রী সরু কোমর মেলে ধরে, নানা রঙের পোশাকের ফিতা উড়িয়ে, লাল ঠোঁট ফাঁক করে মৃদু হাসেন, মুখের ঝিলিক আভা ছড়ায়…… (‘রহস্যচিন্তার ফু’)। পূর্বসূরিদের এই সরাসরি বর্ণনার বদলে বর্তমান রচনাটি প্রথমে একের পর এক সজীব ও অভিনব উপমায় লুও দেবীর প্রথম আবির্ভাবের বহুবর্ণ চিত্র এঁকেছে:「其形也,翩若惊鸿,婉若游龙,荣曜秋菊,华茂春松。仿佛兮若轻云之蔽月,飘颻兮若流风之回雪。远而望之,皎若太阳升朝霞;迫而察之,灼若芙蓉出渌波。」—তাঁর অবয়ব চমকে উড়ে ওঠা রাজহাঁসের মতো হালকা, সাঁতরানো ড্রাগনের মতো নমনীয়, শরতের চন্দ্রমল্লিকার মতো দীপ্ত, বসন্তের পাইনের মতো সুশোভন। পাতলা মেঘে ঢাকা চাঁদের মতো আবছা, ঘূর্ণিবাতাসে ঘোরা তুষারের মতো ভাসমান। দূর থেকে ভোরের মেঘে উদিত সূর্যের মতো নির্মল, কাছে স্বচ্ছ ঢেউ ফুঁড়ে ওঠা পদ্মের মতো উজ্জ্বল। চিত্রের স্পষ্টতা আর রঙের উজ্জ্বলতায় চোখ ফেরানো দায়। এর মধ্যে 「翩若惊鸿,婉若游龙」—চমকে ওড়া রাজহাঁসের মতো হালকা, সাঁতরানো ড্রাগনের মতো নমনীয়—বিশেষভাবে লুও দেবীর ভেসে আসার রূপ ও মাধুর্য জীবন্ত করে তোলে। এই উপমা এবং পরের 「轻云之蔽月」 ও 「流风之回雪」—পাতলা মেঘে চাঁদ ঢাকা পড়া এবং বাতাসে তুষার ঘোরা—দেহভঙ্গির মাধ্যমে হালকা, ভাসমান, প্রবহমান ও নমনীয় গতির অনুভূতি দেয়; অন্যদিকে 「秋菊」、「春松」 এবং 「太阳升朝霞」 ও 「芙蓉出渌波」—শরতের চন্দ্রমল্লিকা, বসন্তের পাইন, ভোরের মেঘে সূর্যোদয় এবং স্বচ্ছ ঢেউ থেকে পদ্মের উদ্ভব—চেহারার মাধ্যমে উজ্জ্বল, নির্মল, সমৃদ্ধ ও মোহনীয় রঙের অনুভূতি দেয়। গতি ও রঙের এই অনুভূতি একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে ও মিশে এক ঝলমলে অলৌকিক দৃশ্য বুনেছে, যা লুও দেবীর অতুল রূপ স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরে। বারবার উপমা প্রয়োগে তৈরি এই প্রবল শিল্পপ্রভাবের ভিত্তিতে লেখক আরও প্রচলিত পদ্ধতিতে দেবীর দেহগড়ন, মুখশ্রী, পোশাক ও আচরণের সূক্ষ্ম চিত্র এঁকেছেন। মি শি-র এই কন্যার দেহ সুষম, কাঁধ ঢালু, কোমর সরু, স্বাভাবিক সৌন্দর্যে প্রসাধনের প্রয়োজন নেই; মেঘের মতো খোঁপা, দীর্ঘ ভ্রু, উজ্জ্বল ঠোঁট ও দাঁত, দীপ্ত চোখ, মৃদু টোল, মুখে জ্যোতি; তার সঙ্গে ঝলমলে রেশমি পোশাক, ঘন সবুজ জেডের অলংকার, দীপ্ত মুক্তা, দুলতে থাকা হালকা আঁচল—সব মিলিয়ে আরও বেশি 「瓌姿艳逸,仪静体闲」—অপরূপ সুশ্রী অবয়ব, শান্ত ও মার্জিত ভঙ্গি। এই বর্ণনা মনে করিয়ে দেয় 《诗经》 বা ‘গীতিসংকলন’-এ ওয়েইয়ের রাজা ঝুয়াংয়ের স্ত্রী ঝুয়াং জিয়াংয়ের প্রশংসা:「手如柔荑,肤如凝脂,领如蝤蛴,齿如瓠犀,螓首娥眉,巧笑倩兮,美目盼兮」(《卫风·硕人》)—হাত কোমল কুশাঙ্কুরের মতো, ত্বক জমাট চর্বির মতো মসৃণ, গলা শুভ্র শূককীটের মতো, দাঁত লাউয়ের বীজের মতো, প্রশস্ত কপাল ও সুন্দর বাঁকানো ভ্রু, কী মনোহর হাসি, কী সুন্দর চোখের চাহনি (‘ওয়েইয়ের গান·মহীয়সী’); আবার সুং ইউয়ের পূর্বপাড়ার সুন্দরীর প্রশংসাও মনে পড়ে:「增之一分则太长,减之一分则太短,著粉则太白,施朱则太赤」(《登徒子好色赋》)—এক বিন্দু বাড়ালে বেশি লম্বা, এক বিন্দু কমালে বেশি খাটো, গুঁড়ো প্রসাধন দিলে বেশি সাদা, রুজ লাগালে বেশি লাল (‘তেংথুৎসির নারীলোলুপতা নিয়ে ফু’)। লেখক স্পষ্টতই তাঁদের প্রভাব পেয়েছেন, তবে পূর্বসূরিদের চেয়ে চরিত্রের গতিময় সৌন্দর্য প্রকাশে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এরপর তিনি লুও দেবীর সরল প্রাণবন্ত আচরণে জোর দিয়েছেন:「践远游之文履,曳雾绡之轻裾。微幽兰之芳蔼兮,步踟蹰于山隅。于是忽焉纵体,以遨以嬉。左倚采旄,右荫桂旗。攘皓腕于神浒兮,采湍濑之玄芝。」—পায়ে নকশা করা ইউয়ানইউ জুতো, কুয়াশার মতো পাতলা পোশাকের প্রান্ত টেনে চলেন। মৃদু অর্কিডের সুবাস ছড়িয়ে পাহাড়ের ধারে পায়চারি করেন। হঠাৎ স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াতে ও খেলতে থাকেন। বাঁয়ে রঙিন পালকের ধ্বজা, ডানে দারুচিনিগাছের ডালের পতাকার ছায়া। ঐশী নদীতীরে শুভ্র কবজি বাড়িয়ে খরস্রোতের ধারে কালো ঝি ঘাস তোলেন। এ পর্যন্ত এসে লুও দেবীর রূপ ও অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ, যেন ডাকলেই সামনে আসবেন। 「余情悦其淑美兮,心振荡而不怡」—তাঁর কোমল সৌন্দর্যে আমার মন মুগ্ধ, হৃদয় আলোড়িত ও অশান্ত—সামনের এই সুন্দরী দেবী লেখককে গভীরভাবে ছুঁয়েছেন। প্রথমে প্রেম জানানোর উপায় না পেয়ে তিনি ব্যথিত, তারপর 「愿诚素之先达」,「解玉佩以要之」—নিজের নির্মল আন্তরিকতা আগে পৌঁছোক চান, জেডের অলংকার খুলে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। মি ফেইয়ের সাড়া পেয়ে, 「执眷眷之款实」—গভীর অনুরাগের সত্যতা ধরে রাখার পর—আবার তাঁর মনে পড়ে হান নদীর তীরে ঝেং জিয়াওফুর জেডের অলংকার হারানোর কিংবদন্তি, আর দেবীর 「指潜渊而为期」—গভীর জল দেখিয়ে মিলনের প্রতিশ্রুতি—নিয়ে সংশয় জাগে। আবেগের এই বারবার মোড় নেওয়া তাঁর তৎকালীন মনের সূক্ষ্ম অবস্থা জীবন্ত করে তোলে। তার প্রতিক্রিয়ায় লুও দেবীও আবেগে আপ্লুত হন। তবে লেখকের ক্ষেত্রে যেমন সরাসরি মানসিক পরিবর্তন বলা হয়েছে, তাঁর ক্ষেত্রে তা হয়নি; বরং একের পর এক কাজের সূক্ষ্ম চিত্রে তাঁর হৃদয়ের উত্তাল গভীর প্রেম এবং সেই প্রেম পূর্ণ না-হওয়ার তীব্র বেদনা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি 「徙倚彷徨。神光离合,乍阴乍阳」—ইতস্তত ঘোরেন, ঐশী আভা কখনো বিচ্ছিন্ন, কখনো মিলিত, কখনো ম্লান, কখনো উজ্জ্বল; কখনো হালকা দেহ তুলে সারসের মতো দাঁড়ান, যেন উড়বেন অথচ ওড়েননি; কখনো গোলমরিচ-সুবাসিত পথ আর সুগন্ধি ঘাসের ঝোপের মধ্যে দিয়ে গিয়ে ঘন সুবাস ছড়ান; কখনো বিষণ্ন দীর্ঘ ধ্বনি তোলেন, যার মধ্যে গভীর বিরহের বেদনা অনুরণিত হয়……লুও দেবীর করুণ সুরে দেবতারা এসে যখন নিশ্চিন্তে 「或戏清流,或翔神渚,或采明珠,或拾翠羽」—কেউ স্বচ্ছ স্রোতে খেলে, কেউ দেবচরে ওড়ে, কেউ উজ্জ্বল মুক্তা কুড়োয়, কেউ মাছরাঙার পালক তোলে—তখন দক্ষিণ শিয়াংয়ের দুই দেবী ও হান নদীর দেবকন্যা পাশে থাকলেও তিনি 「叹匏瓜之无匹兮,咏牵牛之独处」—সঙ্গীহীন পাওগুয়া তারার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, একা ছিয়াননিউ তারার জন্য গান করেন—এবং অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরমুহূর্তে দ্রুত উড়ন্ত জলপাখির মতো কুয়াশাময় বিস্তীর্ণ জলের ওপর অনির্দিষ্ট গতিতে ভাসতে থাকেন। শুধু তাঁর চলমান অনুরাগভরা দৃষ্টি আর বলতে গিয়েও থেমে যাওয়া ঠোঁট যেন লেখকের কাছে মনের অসীম টান ও বেদনা ঢেলে দিচ্ছে। কখনো দেবীর ইতস্তত ঘোরা, কখনো দীর্ঘ সুর তোলা, কখনো দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানো, কখনো ভেসে বেড়ানোর এই বর্ণনা যেন প্রবল আবেগ ও সুন্দর ভঙ্গিতে ভরা এক নৃত্যনাট্য। পরিবর্তনশীল, দোলায়মান নাচের পদক্ষেপে চরিত্রটি নিজের প্রেম, দ্বন্দ্ব, বিষাদ ও যন্ত্রণা প্রকাশ করে। বিশেষত 「体迅飞凫,飘忽若神。凌波微步,罗袜生尘。动无常则,若危若安。进止难期,若往若还」—দেহ উড়ন্ত বুনোহাঁসের মতো ক্ষিপ্র, দেবতার মতো অনির্দিষ্ট গতিতে ভাসে। ঢেউয়ে হালকা পদক্ষেপ, রেশমি মোজা থেকে ধুলোর মতো জলকণা। চলার নিয়ম নেই, কখনো বিপন্ন, কখনো নিশ্চিন্ত। এগোনো-থামা বোঝা যায় না, যেন যাচ্ছেন, আবার যেন ফিরছেন—এই অংশ নৃত্যনাট্যকে চূড়ায় নিয়ে যায়, চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব ও আবেগের ঢেউ এখানে পূর্ণতমভাবে প্রকাশ পায়। লেখক ও লুও দেবী যখন নীরবে মুখোমুখি, পরস্পরের প্রতি অনুরাগে আবদ্ধ, তখন অবশেষে বিচ্ছেদের মুহূর্ত আসে। এটি অভিনব কল্পনা ও ঐশী দীপ্তিতে ভরা এক বিদায়দৃশ্য:পিংই বাতাস থামান, ছুয়ানহৌ ঢেউ শান্ত করেন; ফেংই ও নুওয়ার বাদ্যসংগীতের মধ্যে ছয় ড্রাগনে টানা মেঘরথে মি ফেই যাত্রা করেন, দুই পাশে তিমি আর রথদণ্ডের পাশে অদ্ভুত মাছ পাহারা দেয়। ধীরে দূরে সরে যাওয়া রথে বসেও সুন্দরী লুও দেবী বারবার মুখ ফিরিয়ে লেখককে নিজের অন্তরের কথা বলেন। 「悼良会之永绝兮,哀一逝而异乡」—সুন্দর মিলন চিরতরে শেষ হওয়ায় শোক, একবার চলে গেলে ভিন্ন দেশে থাকার দুঃখ—গভীর বিষাদ এই পুরাণময় চিত্রকে ঢেকে রাখে। 「恨人神之道殊兮,怨盛年之莫当」—মানুষ ও দেবতার পথ আলাদা বলে আক্ষেপ, যৌবনেও মিলন সম্ভব নয় বলে বেদনা—এই সম্পর্কের মূল কথা বলার পর লুও দেবী দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন:「虽潜处于太阴,长寄心于君王。」—গভীর অন্ধকার জলপুরীতে থাকলেও চিরকাল আমার হৃদয় আপনার কাছেই থাকবে। শেষে লুও দেবীর উজ্জ্বল রূপ বিস্তৃত গোধূলিতে মিলিয়ে যায়, কিন্তু লেখক তখনও নদীতীরে দাঁড়িয়ে তাঁর চলে যাওয়ার দিকে বিষণ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, যেন কিছু হারিয়ে ফেলেছেন। আবার দেবীর সুন্দর ছায়া দেখার আশায় তিনি হালকা নৌকায় উজানে চলেন। অথচ কুয়াশাময় জলরাশি আর দীর্ঘ রাত তাঁর অনুরাগ ও চিন্তাকে আরও অবিরাম করে তোলে। ভোর হলে লেখককে বাধ্য হয়ে 「归乎东路」—পূর্বমুখী ফেরার পথ ধরতে হয়, তবু 「揽騑辔以抗策,怅盘桓而不能去」—লাগাম হাতে চাবুক তুলেও বিষণ্ন আকুলতায় ঘুরে থাকেন, যেতে পারেন না। এই অংশ গভীর গীতিময় আবেগে ভরা, তার আছে মনপ্রাণ হরণ করার শক্তি; মানুষের মনে লুও দেবীর রূপকে তা আরও স্পষ্ট, আরও পূর্ণ করে আঁকে ও উজ্জ্বল করে তোলে।

এই ফু-র প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনটি:প্রথম বৈশিষ্ট্য, সমৃদ্ধ কল্পনা। লেখক রাজধানী লুওইয়াং থেকে পূর্বে নিজের সামন্তভূমি জুয়ানচেংয়ের দিকে রওনা দেন। পথে লুও নদীর তীরে রথ থামিয়ে ঘোড়াকে জল খাইয়ে, ইয়াংলিনে পায়চারি করার সময় লুও দেবী মি ফেইকে দেখেন—এটাই কল্পনা। তাঁর দেহভঙ্গি চমকে উড়ে ওঠা বুনোরাজহাঁসের মতো দোলায়মান ও ভাসমান, জলের ড্রাগনের মতো নমনীয় ও কোমল; সজীব শোভায় শরতের চন্দ্রমল্লিকা ও ঘন পাইনকেও ছাড়িয়ে যান, ভোরের মেঘের মতো সুন্দর, পদ্মের মতো পবিত্র, রূপমাধুর্যে অতুলনীয়। এরপর লেখক তাঁর প্রেমে পড়েন, জলের ঢেউ দিয়ে মনের কথা জানান, জেডের অলংকার দিয়ে ভালোবাসার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু দেবীর পবিত্র মহিমা তাঁকে অসংযত হতে দেয় না। অবশেষে লুও দেবী তাঁর আন্তরিকতায় আপ্লুত হয়ে দেখা দেন, নিজের প্রেম উজাড় করে দেন। তবু মানুষ ও দেবতার পথ পৃথক বলে মিলনের আশা নেই, অনিচ্ছায় বিদায় নেন। কল্পনা বর্ণময়, রোমান্টিক করুণ অনুভূতি মৃদু হয়েও মিলিয়ে যায় না, পাঠকের মনে দীর্ঘশ্বাস আর সূক্ষ্ম বিষাদ জাগায়। তবে এই কল্পনা অমূলক উদ্ভট নয়, কারণ ফু-টি সুং ইউয়ের 《神女赋》 বা ‘দেবীর ফু’ এবং 《高唐赋》 বা ‘কাওথাং ফু’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রচিত।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য, ভাষার অলংকার সমৃদ্ধ হলেও চঞ্চল নয়; চারদিকে সতেজতার আবহ ছড়ায়, মন প্রফুল্ল হয়। সমান্তরাল বাক্যবিন্যাস, প্রতিসাম্য ও ছন্দের যত্নে ভাষা সুসংবদ্ধ, সংহত, জীবন্ত ও সুন্দর। বিষয় নির্বাচন ও পরিকল্পনায় হান যুগের ফু-র মধ্যে এর সমকক্ষ নেই। এই ফু-র সূচনাতেই সাধারণের মধ্যে অসাধারণ লুকিয়ে থাকা এক পরিবেশ তৈরি হয়। শুরুতে সরল বর্ণনা, যেমন থাও ইউয়ানমিংয়ের 《桃花源记》 বা ‘পীচফুলের উৎসের কাহিনি’-তে উলিংয়ের মানুষের নৌযাত্রার শুরু; আশ্চর্য জগতের আবির্ভাবের কোনো পূর্বাভাস থাকে না। কিন্তু ঠিক তখনই লেখক মুহূর্তের মধ্যে সারাজীবন মনে রাখার মতো এক দৃশ্য দেখেন:এক সুন্দরী নারী, অর্থাৎ লুও দেবী আবির্ভূত হন। এরপর যেন সুং ইউয়ের কলমে আঁকা উশানের দেবীর সঙ্গে সৌন্দর্যে পাল্লা দিতে, লেখক লুও দেবীর দীপ্তি, সুন্দর মুখ আর যন্ত্রণার অবস্থা গভীর যত্নে আঁকেন। শেষে দেবীর সঙ্গীদের নিয়ে চলে যাওয়ার দৃশ্য, ছু ইউয়ানের 《离骚》 বা ‘লিসাও’-তে নায়কের শোকার্ত দূরযাত্রার বর্ণনার সঙ্গে ভিন্ন পথে একই শিল্পসার্থকতায় পৌঁছেছে।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য, প্রাণবন্ত চিত্রণের সঙ্গে উপমা ও পরিবেশের সাহায্যে ভাব ফুটিয়ে তোলা এমন কুশলী ও যথাযথভাবে মিশেছে যে তা বিস্তৃত হয়েও বিরক্তিকর নয়, সুন্দর হয়েও চমকে দেয় না; মনে হয় অপূর্ব এক চিত্র দেখছি, যার চরিত্র রক্তমাংসের, শূন্য কল্পনা বলে মনে হয় না। লুও দেবীর দেহগড়ন, মুখাবয়ব ও ভঙ্গির বর্ণনা তাঁর এমন রূপের অনুভূতি দেয়, যা দেখে মাছ ডুবে যায়, উড়ন্ত রাজহাঁস নেমে আসে। একই সঙ্গে রয়েছে 「清水出芙蓉,天然去雕饰」—স্বচ্ছ জল থেকে পদ্মের মতো উঠে আসা, স্বভাবতই অলংকরণবিহীন—সতেজ পবিত্রতা। মিলনের সময় লুও দেবীর অভিব্যক্তির চিত্রণে মনে হয়, মনোহর ভঙ্গিতে তিনি চোখের সামনে ভেসে উঠছেন। আর বিচ্ছেদের বর্ণনায় 「屏翳收风,川后静波,冯来鸣鼓,女娲清歌。」—পিংই বাতাস থামান, ছুয়ানহৌ ঢেউ শান্ত করেন, ফেংলাই ঢাক বাজান, নুওয়া নির্মল সুরে গান করেন। প্রেম এত আন্তরিক, এত নির্মল, সব এত সুন্দর যে বিচ্ছেদের পর মানুষ চলে গেলেও মন রয়ে যায়, আবেগের ধারা থামে না। লুও দেবীর সুন্দর রূপ ও দেখা হওয়া, পরস্পরকে চেনার মুহূর্তগুলো স্পষ্ট চোখে ভাসে; রোমান্টিক অথচ তিক্ত এই অনুভবে মন অশান্ত হয়ে লুও নদীর কাছে ঘুরে বেড়ায়, চলে যেতে পারে না।

পূর্বসূরিরা 《洛神赋》 বা ‘লুও দেবীর ফু’-র ভাবগত ও শিল্পগত অর্জনকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন; তার স্পষ্ট প্রমাণ, একে প্রায়ই ছু ইউয়ানের 《九歌》 বা ‘নয় গান’ এবং সুং ইউয়ের 《神女》 বা ‘দেবী’ প্রভৃতি ফু-র সমকক্ষে রাখা হয়। আসলে ছাও ঝির এই ফু-তে দুই ধারাই মিলেছে; 《湘君》 বা ‘শিয়াংয়ের প্রভু’ ও 《湘夫人》 বা ‘শিয়াংয়ের দেবী’-র গভীর গীতিময় আবেগ যেমন আছে, তেমনি সুং ইউয়ের ফু-গুলোর নারীসৌন্দর্যের সূক্ষ্ম চিত্রণও আছে। তাছাড়া পূর্ণাঙ্গ কাহিনি, বহুবিধ শিল্পকৌশল এবং স্থায়ী রসসমৃদ্ধ রূপের মতো উৎকর্ষে এটি পূর্ববর্তী রচনাগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে।


মন্তব্য

পাঠানো হচ্ছে

কবিতা থেকে,গল্পের ভুবনে পা রাখুন

কবিতা থেকে উদ্ভূত উপন্যাস

প্রাচীন পটভূমিতে অলৌকিক ছায়া ও নদনদীর উপন্যাস

লুও নদীর রেখে যাওয়া নাম

গোধূলিতে শেন মি লুও নদীর পাথরের সিঁড়িতে দেখতে পেল সতেরো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বোনের লাল জুতো। জুতোর তলা এখনো উষ্ণ, অথচ জুতো নিয়ে আসা নারী কাদাচরে দাঁড়িয়ে, পোশাকের প্রান্তে এক ফোঁটা জলও লাগেনি। সে তাকে এক প্রহরের সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি দিল, শুধু পুরোনো জলকপাটের ঘরে ফিরে সেদিনের অসমাপ্ত কথাগুলো শেষ করতে হবে। ওপারের আলোকিত জানালাগুলো একে একে জেগে উঠল, নদীর জলে চাপা পড়া একটি পুরোনো ঘটনাও মানুষের কণ্ঠ পেতে শুরু করল।

পড়া শুরু করুন

AI-এর সহায়তায় রচিত · চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহ কাল্পনিক

জনপ্রিয় কবিতা

আপনার থিম বাছুন

আপনার থিম পুরো সাইটে প্রযোজ্য হবে।