প্রাচীন আবহে সমাজজীবনের দীর্ঘ উপন্যাস
মা তাঁর হয়ে যে কথা বলেছিলেন
কু উজি · AI-সৃষ্ট রচনা · 9079 অক্ষর · প্রায় 10 মিনিট
আ সুই দ্বিতীয়বার কারখানায় এলেন বছরের শেষ চান্দ্রমাসের এগারো তারিখের সকালে। আগের রাতে ফিরে তিনি এপাশ-ওপাশ করেছেন। বারবার মনে পড়েছে, ওয়েই ছে কাঠ কটা বুকে নিয়ে কেমন চুপ করে ছিল। তাঁর মনে হয়েছে, ছেলের প্রতি যে অবিচার হয়েছে তা শুধু তাঁর একার জানা উচিত নয়। সকালের খাবার অন্য দিনের চেয়ে বেশি করে ভরেছিলেন। দরজায় পৌঁছে আগে কিশোরটির দিকে একটা বাটি এগিয়ে দিলেন। গলার সুর তখনও এমন, যেন ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া হয়নি এমন এক ছোটকে দেখতে এসেছেন।
ওয়েই ৎসে বলল, সে খেয়ে এসেছে। আ সুই ভাবল, ছেলেটা ভদ্রতা করছে। বাটিটা আরও কাছে এগিয়ে দিয়ে বলল, তোমার বড় গুরুভাই আজকাল খুব ব্যস্ত। তোমাদের চোখ ভালো, পাশে থেকে একটু বেশি নজর রাখলে কাজও বাঁচে। ‘পাশে’ কথাটা শুনে ছেলেটার হাত কাজের টেবিলে থেমে গেল, বাটি নিল না। শু শেন ভেতরের ঘর থেকে শুনছিল। বেরিয়ে আসতে আসতে মা ছোট চিরুনিটার কথায় পৌঁছে গেছে। নিজের বাড়ির লোকের পছন্দ তো পছন্দই, তবে আগে যে কাজটা করার সেটা ঠিকঠাক করতে হয়।
“খুড়ি কি দেখেছেন, আমার কোন কাটটা ভুল হয়েছে?” ওয়েই ছ্যে জিজ্ঞেস করল।
ও এমন জবাব দেবে আ সুই ভাবেননি। বাটিটা মাঝ আকাশে ধরা, কানায় ঝোলটা হালকা দুলল। সে গলা চড়ায়নি, তাই ছেলেমানুষের রাগ বলে উড়িয়েও দিতে পারলেন না। শুধু বললেন, তিনি বাটালির হিসাব চাইতে আসেননি। শু শেন তাড়াতাড়ি এগিয়ে বাটিটা নিয়ে মাকে একদিকে সরিয়ে নিতে চাইল। তার মধ্যেই মা যোগ করলেন, তোমার বড় গুরুভাইয়ের মন সোজা, কিছু ঘটলে মুখ ফুটে বলতে চায় না, তুমিও যেন সব ভুলে যেয়ো না।
ওয়েই ৎসে এবার চোখ তুলে বলল, তার মনে আছে বলেই যে কাজ তাকে করতে বলা হয়নি, সে তার দায় নিতে পারে না। ছোট চিরুনির কথা আর তুলল না। কাজের টেবিলে রাখা মাপ নেওয়া কাঠটা তুলে উঠোনে চলে গেল। আ সুই দাঁড়িয়ে রইল। পিঠের ওপর দিয়ে এক দফা গরম ছড়িয়ে গেল। তার মনে হলো, যেন সে দুটো কথা বেশি বলেনি, বরং এই তরুণটাই কারখানায় তাকে একজন বয়োজ্যেষ্ঠের প্রাপ্য জায়গা থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
ওইখানেই শু শেন মাকে বলল না যে ওয়েই ছ্যেকে আবার মাপ নিতে সে নিজেই বলেনি। ঝোলটা নামিয়ে বলল, আগে একটু খেয়ে নাও, তারপর দরজা খোলা যাবে। ছেলে এখনও তার পক্ষেই দাঁড়িয়েছে দেখে মায়ের আরও মনে হল, একটু আগে শুধু মনের মতো ন্যায্য একটা জবাব সে পায়নি। সে জানত না, তার কাছে যেটুকু ন্যায্য, ওয়েই ছ্যের কানে তা শোনায় এমন এক আবদারের মতো, যেন অন্য কারও মানসম্মান পড়ে যেতে না দিয়ে তাকেই ঠেকিয়ে রাখতে হবে।
রেন ছুয়ান সবটা বুঝে পরদিন আগে ওয়েই ৎসেকে একশ বিশ ওয়েন দিলেন। নিজের উদারতার কথা বললেন না। শুধু শু শেনকে জানালেন, এই টাকা তাকে ফেরত দিতে হবে। একা কাজের বরাত নিলে যে কাজ করেছে তার পাওনা নিজের মুখরক্ষা হওয়া পর্যন্ত আটকে রাখা যায় না। শু শেন মাথা নাড়ল। ওয়েই ৎসে গুনে টাকা রেখে রোজকার মতো কারখানার সেদিনের জানালার কাজ করল। টাকা হাতে এসেও তার কাঁধের আড়ষ্টতা এমনভাবে কাটল না যে আগের মতো বেঁকে যাওয়া নকশা দেখিয়ে গুরুভাইকে জিজ্ঞেস করতে পারে, পাখির মতো দেখাচ্ছে কি না।
ভাঙা দরজাটা নিয়ে আর দেরি চলল না। রেন ছুয়ান আর শু শেন খাটো হয়ে যাওয়া কবজার দণ্ডটা খুলে নিল, অক্ষত শুকনো কাঠ বসাল, নিচের খোপটা নতুন করে মেলাল। যে সারি ঘাসপাতা চেঁছে ফেলতে এত মায়া ছিল, খোলা আর জোড়ার মধ্যেই তার বেশির ভাগ গেল। শু শেন নিজের হাতে রন্দা চালাল। কাঠের ছিলকা স্তরে স্তরে উঠল। আগে গেল পাতার ডগা, তারপর গেল বহু রাত ধরে নিজের হাতে ঘষা অগভীর বাঁকটাও। কাঠের তলায় কাঠই থাকে। তার মনে কষ্ট হলো বলে দরজা এক বিন্দুও বেশি স্থির হবে না।
রেন ছুয়ান মেরামতের সব কাঠের ভার তার ওপর চাপালেন না। দরজা স্থির আছে শুনে তিনি নিজেও আর দেখতে আসেননি, এক রাতের জন্য ঠেকনা দেওয়ার অনুমতিও দিয়েছিলেন। ওস্তাদ আর দোকানের মালিক হিসেবে তাঁর ভাগের দায় শুধু শাগরেদকে বকে মিটবে না। তাঁর যা দেওয়ার, সেই কাঠ তিনি দিলেন। শু শেন খাটল, আলাদা মজুরি নিল না। তেরো তারিখেই দরজাটা যেভাবে বসানো উচিত সেভাবে আবার বসিয়ে দিল তারা।
চৌ থোং দরজা পরখ করলেন যে হাতে চোট লাগেনি, সেই হাত দিয়ে। প্রথমে নিচের আধারটা দেখলেন, দুজনকে কয়েকবার খুলতে আর বন্ধ করতে বললেন। তারপর নিজেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলেন, পাল্লা তাঁর গায়ের দিকে হেলে আসে কি না। দরজা বুঝে নেওয়ার দিনের মতো অনায়াসে হাত দিয়ে ঠেকাতে তাঁর সাহস হলো না। গোটা শরীরটা একটু তফাতে রাখলেন। সেইটুকু তফাত দেখে শু শেনের হঠাৎ খুব ইচ্ছে হলো, লোকটা তাকে বকুক। বকা শেষ করে আবার দরজায় হাত দিলেও এতটা কষ্ট হতো না, যতটা হচ্ছে তাঁকে এভাবে ভরসা করে কাছে আসতে না দেখে।
দরজাটা ঠিকমতো বন্ধ হতে চৌ থোং শুধু বললেন, এবার এই পর্যন্তই থাক, আর কিছু যোগ কোরো না। শু শেন বসন্তের জানালার কথা তুলল। তিনি আবার বললেন, আপাতত হাত দিয়ো না। হাতের পট্টি বদলানো হয়েছে, ফোলা একবারে কমেনি। খদ্দের এলেই তাঁর পক্ষে হাতে চোট লাগেনি এমন ভান করাও সম্ভব নয়। শেষমেশ মজবুত হয়ে দাঁড়ানো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শু শেন প্রথম সত্যি করে সেই পরিণতির মুখোমুখি হলো, যার ভার নেবে বলে সে আগে ভাবেনি: কিছু জিনিস মজবুত করে সারালেও মানুষের মনে থাকে কীভাবে ব্যথা পেয়েছিল।
ছেন শেং পেছনের উঠোনে ঝুড়ি গুছিয়ে নিচ্ছিল। বসন্তের জানালার কাজটা এখনও আটকে আছে শুনে মনে হল, চৌ থোং মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানোর এতটুকু জায়গাও দিতে চায় না। সে জানে, তার মতো একজন বোঝাবওয়া লোকের কথার তেমন ওজন নেই। তবু না বলে পারল না যে শু ওস্তাদ বরাবর খুঁটিয়ে কাজ করে, ছোট ওস্তাদও প্রায়ই মাপনি নিয়ে এসেছে। এই কথা বলতেই নিজের মনে একটু খটকা লাগল। ওয়েই ছ্যেকে মাপনি হাতে দেখেছে, দরজার পাশ দিয়ে যেতে দেখেছে, কিন্তু মাপনিটা নতুন পাথরের ওপর রেখেছিল, না এনে রাখা কোনো ছোট কাঠের টুকরোর ওপর, তা নিজের চোখে দেখেনি।
চৌ থোং জিজ্ঞেস করল, কোন জায়গাটা মাপতে দেখেছে। ছেন শেং উত্তর দিতে পারল না। তাড়াতাড়ি বলল, সে নজর রাখেনি, শুধু লোকটা এসেছিল। চৌ থোং বলল, এসেছিল মানেই ঠিকঠাক মাপা হয়েছে, তা তো নয়। তারপর আর প্রশ্ন করল না। ছেন শেংকে তাড়িয়েও দেওয়া হলো না, পরের ঝুড়িগুলোও পৌঁছে দিতে পারবে। তবু সত্যি সত্যি এক দফা বকুনি খাওয়ার চেয়েও তার বেশি অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আরেকটা কথা জুড়ে দিয়ে আগের ফাঁকটুকু ভরাট করে।
সে যখন শু শেনকে খুঁজতে গেল, পেছনে কর্মচারী ততক্ষণে কথাটা এমনভাবে বলছে যেন ছেন শেংও ওয়েই ছ্যেকে এসে মাপ নিতে দেখেছে। শু শেন শুনে প্রথমে শুধরে দিল না। ভাবল, ছেন শেং তাকে সাহায্য করতে চেয়েছে, অন্যের সামনে তার ওই সদিচ্ছাকে ভেঙে দেওয়া ঠিক হবে না। মনের আরও গভীরে সত্যিই মনে হল, এতে সব ভারটা অন্তত তার একার ওপর চাপছে না। ছেন শেং পাশে দাঁড়িয়ে শুনল, কথাটা তার নিজের চোখে দেখা জায়গা ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে। সেও সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে কথাটা ফিরিয়ে নিল না।
আ সুই আবার এসে ঠিক আধখানা কথা শুনল। আগাপাছা জানত না, শুধু মনে হলো সকালে যা বলেছিল, তা হয়তো ভুল বলেনি। ছেলেকে অপ্রস্তুত করতে পারে ভেবে সে আর ওয়েই ছের কাছে তর্ক করতে গেল না। কিন্তু যে ধারণার কোনো প্রমাণ ছিল না, সেটা মনের ভেতর আরও শক্ত করে রেখে দিল। গরম ভাতের হাঁড়িটা খালি। ঘরে ফেরানোর সময় তবু বেশ ভারী লাগল, যেন বহু লোক যে কথাটা স্পষ্ট করে বলতে চায়নি, তার ওজনের এক টুকরো কাঠ তাতে যোগ হয়েছে।
পুরোনো দরজাটা মেরামত করে মজবুত করা হয়ে গেছে, এবার নিয়মমতো বাকি কাজ একটু একটু করে এগোনোর কথা। সু শেন কিনা নতুন করে দরজার নকশা আঁকতে বসল। আগের সেই পুরোপুরি মোছা যায়নি এমন কয়লার গুঁড়োটুকু ছড়িয়ে দিয়ে ভাবল একেবারে নতুন একটা দরজার কথা, কবজার অক্ষ আরও লম্বা হবে, ঠেকনাটা আরও মজবুত, ফুলের নকশাটাও আরও মিহি করা যাবে। চৌ থোং যদি দেখে, সে শুধু দায় সারতে মেরামত করেনি, তাহলে হয়তো বসন্তের জানলাটার কাজও দিতে রাজি হবে। আর লোকে যদি ওষুধের দোকানের পাশ দিয়ে এখনও যাতায়াত করে, অন্তত মনে পড়তে পারে, ওই ঘাসপাতাটা খোদাই করার উদ্দেশ্য একটা বাজে দরজা বানানো ছিল না।
চৌ থং কখনও এই নতুন দরজাটা চাননি। রেন ছুয়ানও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, পুরোনো দরজাটা মজবুত করা হয়েছে, ওতেই চলে। খদ্দের বাড়তি কিছু লাগাতে না করলে আপাতত লাগিয়ো না। শু শেন শুনলেন, অথচ তাঁর মনে হতো এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু না করলে লোকে চিরকাল ওই পড়ে যাওয়া দরজাটা দিয়েই তাঁকে চিনবে। আরও বড় কিছু করতে চাইছিলেন, যাতে লোকে শুধু তাঁর খারাপ কাজটাই দেখতে না পায়, আর মাও পরে লোকের সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারেন।
ছেলে কয়েক রাত ঘুমোয়নি দেখে আ সুইও মনে মনে অস্থির হয়ে উঠলেন। প্রথম যখন ঘর ভাড়া নেওয়া হয়, তিনি সেখানে ছিলেন না। কিন্তু জানতেন ছেলে কীভাবে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছে। জুতোর তলা ফুটো হওয়া পর্যন্ত পরে, তারপর তাপ্পি দেয়। নতুন তুলো-ভরা জামার কথা উঠলেই প্রতি বছর বলে পুরোনোটাই এখনও গরম রাখে। অথচ পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার চালটা ভালো দেখে বেছে নেয়। এখন শুধু একটা দরজার জন্য দোকানে ছেলের দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও যেন সরু হয়ে গেছে। এটা তিনি সইতে পারছিলেন না। ওই জায়গাটা আরেকটা নতুন দরজা দিয়েই কিনে ফিরিয়ে আনতে হবে কি না, তা জিজ্ঞেস করলেন না।
চৌদ্দ তারিখে তিনি লুকিয়ে রাখা টাকা বের করলেন। আটশো তিরিশ ওয়েন আগেই গোনা ছিল। ছয়শো সরিয়ে নিলে দুশো তিরিশ থাকে। পুরোনো কাপড়ে তিনশো করে গাঁথা টাকার মালা মুড়ে হাতলওয়ালা ঝুড়ির তলায় চাপা দিলেন। হাতে ঝুলিয়ে দেখলেন, এক হাঁড়ি ভাতের চেয়েও ভারী। চালের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দোকানদার যথারীতি জিজ্ঞেস করলেন চাল নেবেন কি না। তিনি মাথা নাড়লেন, যেন তাঁর চোখের সামনে দিয়েই এমন এক দূরযাত্রা গোপন করে নিয়ে যাচ্ছেন, যার কথা কাউকে জানতে দেওয়া যায় না।
রেন ছুয়ান শুনলেন আ সুই নতুন দরজার কাঠ কিনতে চান। প্রথমেই বললেন, আগের দরজা মেরামত হয়ে গেছে, আবার খরচ করার দরকার নেই। তিনি বিশ্বাস করছেন না দেখে রেন ছুয়ান আরও স্পষ্ট করে বললেন, ছয়শো ওয়েনে মানানসই শুকনো কাঠ কেনা যাবে। তা দিয়ে পরের সব কাজ কেনা যাবে না, চৌ থোং তাঁর ছেলের উপহার নেবেন এমন নিশ্চয়তাও নেই। একজন মায়ের সমস্ত আশা তিনি নিজের কাঁধে নিতে চাননি। তবে তাঁর কারখানায় কাঠ বিক্রি করতেই হয়, শুধু মন নরম হলেই তো খাওয়ার প্রয়োজন ফুরোয় না।
আ সুই মাথা নেড়ে বলল, সে বুঝেছে, টাকাটা আপাতত এখানেই রাখুক। শুকনো কাঠ পাওয়া যাবে, আবার বানানো যাবে, এইটুকু তার কানে ঢুকল। কোনো নিশ্চয়তা নেই, কথাটা ঢুকল না। টাকা নেওয়ার আগে রেন ছুয়ান আবার বলল, এই চালানটা শুধু কাঠ বিক্রি হিসেবেই ধরা হবে। বাইরের কোণে দ্বিতীয় মাসের পঞ্চম দিন পর্যন্ত রাখা যাবে, তারপর নতুন কাঠ এলে জায়গা খালি করতে হবে। পুরোনো চেনাজানা লোক বলে অনির্দিষ্টকাল স্তূপ করে রাখা যাবে না। সে তাতেও রাজি হল। ভাবল, শেনকে এখনও কাঠ বেচতে রাজি যখন, তখন তাকে একেবারে ত্যাগ করেনি।
শু শেন ফিরে নতুন কাঠের পাশে মায়ের কাপড়ের পুঁটলিটা দেখে এক নজরেই বুঝল কে এসেছে। মাকে টেনে দোকানের বাইরে নিয়ে বলল, তোমার টাকা নেব না বলে কি কথা হয়নি। আ সুই জিজ্ঞেস করল, এখন তার কাছে কত আছে। সে চুপ করে রইল। আ সুই আবার বলল, কম হলে সে আরও একটা উপায় ভেবে দেখতে পারে। বলতে বলতেই মনে পড়ল, পুঁটলিতে সত্যিই আর মোটে দুগাছি খুচরো মুদ্রা আছে। পরের কথাটা আর তেমন জোর দিয়ে বলতে পারল না।
সে প্রথমে টাকা ফেরত দিতে চেয়েছিল, পুঁটলির কোণে হাতও রাখল, কিন্তু তুলে নিল না। এ যে ছয়শো ওয়েন। একবেলার খাবার কিংবা আশ্রয় নেওয়া কারও জন্য কয়েকটা সুইয়ে সুতো পরিয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার নয় যে দুজনেই হেসে মিটিয়ে নেবে। সে বলল পরে শোধ করবে, কিন্তু মা আগেই বলে দিল, শোধের কথা না ভেবে তাড়াতাড়ি দরজাটা বানিয়ে ফেলতে। মা তার দিকে চেয়েই রইল, যেন সে একবার হাত বাড়ালেই সব কাঠের কাজ ভালো করে করতে পারত যে ছেলেটি, তাকে আবার শক্ত করে ধরে ফেলতে পারবে।
শেষে সে মাথা নাড়ল। টাকা পেয়ে কাঁধের ভার খুব একটা কমল না। মায়ের ওইটুকু বিশ্বাস নতুন কাঠের ওপর এমনভাবে চেপে বসল যে কাজ শেষ হলেও হয়তো কেউ দেখতে চাইবে না, এ কথা বলা তার পক্ষে আরও কঠিন হয়ে গেল। রেন ছুয়ান ভেতর থেকে বেরিয়ে মনে করিয়ে দিল, চালু কাজের টেবিল দখল কোরো না। কাঠ কটা আপাতত বাইরের কোণে রাখা যাবে, কাজ শুরু করলে অন্য জায়গা দেখতে হবে। শু শেন মায়ের দিকে তাকিয়ে বুঝল, এখানে থেকে যাওয়ার কথা সে আগে যেমন ভেবেছিল, মা-ও এই কথার তেমন মানে করেনি।
নানহুয়াই গলিতে ফেরার পথে আ সুই বাইরের ছাউনির চাবিটা হাতড়ে বার করলেন। আগে বললেন, বসন্তে লিউ খুড়ি তাকে জানালাটা সারিয়ে দিতে বলেছেন, ছাউনি খালি, কয়েকটা কাঠ রাখলে কিছু হবে না। শু শেন জিজ্ঞেস করল, কথাটা হয়েছে কি না। মা বললেন, লিউ খুড়ি চাবিই ধার দিয়েছেন, তাঁরা তো আপনজন, তার ওপর জানালাও সারাতে হবে। শুনে শু শেনের মনে হলো, আবার জিজ্ঞেস করতে গেলে যেন বন্ধুকে বড় বেশি হিসেবি ভাবা হয়। নতুন কাঠ কোথায় রাখবে সে নিয়ে উৎকণ্ঠাটা আপাতত চাপা দিল।
সেই রাতে শ্যু শেন কাগজে আগের চেয়ে বেশি পরিপাটি একটা দরজা আঁকল। ঘাসপাতার পাশে জলের একটা খুব সরু ঢেউয়ের রেখা যোগ করল। বৃষ্টির পরে কাঠের রং কেমন হবে ভাবতে গিয়ে মায়ের ঝুড়ির তলায় থাকা দুই ছড়া মুদ্রার কথাও মনে পড়ল। কাগজটা উল্টে দেখল, পেছনটা একেবারে খালি। হঠাৎ আর তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করল না। সে আবার সোজা করে কাঠের চাপা দিয়ে রাখল। জানালার বাইরে কেউ বাড়ি ফিরল, দরজা ঠেলার শব্দ হল। সে শুনল, আর তার প্রথম ভাবনা তখনও এই যে কবে তার দরজাটা দেখে লোকে আবার বলবে, ভালো হয়েছে।
· এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ·
এই বই AI-এর সহায়তায় মৌলিকভাবে রচিত, লিউ ছাংছিংয়ের 《逢雪宿芙蓉山主人》 বা ‘তুষারে পড়ে ফুরং পাহাড়ের গৃহস্বামীর বাড়িতে রাতযাপন’ এবং এই সাইটের মূল ছোটগল্প 《雪夜留门》 বা ‘তুষাররাতে খোলা দুয়ার’ অবলম্বনে বিস্তৃত করা হয়েছে। চরিত্র, জেলা শহর, পথ ও কাহিনি সবই থাং যুগের আবহে নির্মিত কাল্পনিক জগতের অংশ; এটি মূল কবিতার অনুবাদ বা কবির জীবনী নয়।
মন্তব্যের বিভাগ
মন্তব্য লোড হচ্ছে…
কিছু বলতে চান?মন্তব্য করতে লগইন করুন →